Wednesday, September 30
Shadow

নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব, মাকরূহ ও নামাজ ভঙ্গের কারনসমুহ

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

নামাজের ফরজসমূহ (আরকান ও আহকাম)ঃ

আহকাম ও আরকান মিলিয়ে নামাজের ফরজ মোট ১৩টি। নামাজ শুরু হওয়ার আগে বাইরে যেসব কাজ ফরজ, সেগুলোকে নামাজের আহকাম বলা হয়। 

নামাজের আহকাম ৭টি। যথাঃ

১. শরীর পাক হওয়াঃ  এ জন্য অজুর দরকার হলে অজু বা তায়াম্মুম করতে হবে, গোসলের প্রয়োজন হলে গোসল বা তায়াম্মুম করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ فَٱغْسِلُوا۟ وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى ٱلْمَرَافِقِ وَٱمْسَحُوا۟ بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى ٱلْكَعْبَيْنِ ۚ
হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা (ধৌত কর)।  (সূরা মায়েদাঃ ৬)

২. কাপড় পাক হওয়াঃ  পরনের জামা, পায়জামা, লুঙ্গি, টুপি, শাড়ি ইত্যাদি পাক পবিত্র হওয়া।এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ আর তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র কর।(সূরা মুদ্দাসসিরঃ ৪)

৩. নামাজের জায়গা পাক হওয়াঃ  অর্থাৎ নামাজির দু’পা, দু’হাঁটু,দু’হাত ও সিজদার স্থান পাক হওয়া।

৪. সতর বা শরীর ঢাকাঃ  পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের দু’হাতের কব্জি,পদদ্বয় এবং মুখমন্ডল ব্যতীত সমস্ত দেহ ঢেকে রাখা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ
يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ
অর্থঃ হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর।  (সূরা আরাফঃ৩১)

৫. কিবলামুখী হওয়াঃ  কিবলা মানে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া।এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ
وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۚ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُ
আর তুমি যেখান থেকেই বের হও, তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, তার দিকে তোমাদের চেহারা ফিরাও।  (সূরা বাকারাঃ ১৫০)

৬. ওয়াক্ত অনুযায়ী নামাজ পড়াঃ  প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজ সময়মতো আদায় করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃإِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ كَانَتْ عَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ كِتَٰبًا مَّوْقُوتًا নিশ্চয় সলাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরয।  (সূরা নিসাঃ১০৩)

৭. নামাজের নিয়্যাত করাঃ  নামাজ আদায়ের জন্য সেই ওয়াক্তের নামাজের নিয়্যাত করা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ إنما الأعمال بالنية নিশ্চই আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল।  (বুখারী,হাদিস-১)

নামাজ শুরু করার পর নামাজের ভেতরে যেসব কাজ ফরজ, সেগুলোকে নামাজের আরকান বলা হয়।

নামাজের আরকান ৬টি।যথাঃ

১. তাকবিরে-তাহরিমা বলাঃ  অর্থাৎ আল্লাহর বড়ত্বসূচক শব্দ দিয়ে নামাজ আরম্ভ করা। তবে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে  নামাজ আরম্ভ করা সুন্নাত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْআর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।  (সূরা মুদ্দাসসিরঃ৩)

২. দাঁড়িয়ে নামাজ পড়াঃ  মানে কিয়াম করা। আল্লাহ বলেনঃ حَٰفِظُوا۟ عَلَى ٱلصَّلَوَٰتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلْوُسْطَىٰ وَقُومُوا۟ لِلَّهِ قَٰنِتِينَ
তোমরা সলাতসমূহ ও মধ্যবর্তী সালাতের হিফাযত কর এবং আল্লাহর জন্য দাঁড়াও বিনীত হয়ে।  (সূরা বাকারাঃ ২৩৮)

৩. ক্বেরাত পড়াঃ  চার রাকাতনিশিষ্ট ফরজ নামাজের প্রথম দু’রাকাত এবং ওয়াজিব,সুন্নাত,নফল নামাজের সকল রাকাতে ক্বিরাত পড়া ফরজ। আল্লাহ বলেনঃ فَٱقْرَءُوا۟ مَا تَيَسَّرَ مِنَ ٱلْقُرْءَانِ
অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়।  (সূরা মুযাম্মিল,আয়াতঃ ২০)

৪. রুকু করাঃ  প্রতিটি নামাজের প্রত্যেক রাকাতে রুকু করা ফরজ।এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرْكَعُوا۟ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ
অর্থঃআর তোমরা সলাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর।  (সূরা বাকারাঃ৪৩)

৫. সিজদা করাঃ  নামাজের প্রত্যেক রাকাতে সিজদা করা ফরজ।আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱرْكَعُوا۟ وَٱسْجُدُوا۟ وَٱعْبُدُوا۟ رَبَّكُمْ وَٱفْعَلُوا۟ ٱلْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ۩
অর্থঃ হে মুমিনগণ, তোমরা রুকূ’ কর, সিজদা কর, তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং ভাল কাজ কর, আশা করা যায় তোমরা সফল হতে পারবে।  (সূরা হজ্জঃ৭৭)

৬. শেষ বৈঠক করাঃ  নামাজের শেষ রাকাতে সিজদার পর তাশহুদ পড়তে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় বসা।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
ثُمَّ اجْلِسْ فَاطْمَئِنَّ جَالِسًا ثُمَّ قُمْ فَإِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ فَقَدْ تَمَّتْ صَلاَتُكَ
অর্থ, “অতঃপর ধীর স্থিরভাবে উঠে বসবে। পরে উঠে দাঁড়াবে। এইরূপ করতে পারলে তবে তোমার সালাত পূর্ণ হবে।

সূত্রঃ বুক অব ইসলামিক নলেজ, লেখকঃ ইকবাল কবীর মোহন

নামাযের ওয়াজিবসমূহঃ

ওয়াজিব অর্থ হলো আবাশ্যক। নামাযের মধ্যে কিছু বিষয় আছে অবশ্য করণীয়। তবে তা ফরজ নয়, আবার সুন্নাতও নয়। যা ভুলক্রমে ছুটে গেলে সিজদায়ে সাহু দিতে হয়।আর ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে নামায ভঙ্গ হয়ে যায়। নিচে ওয়াজিবসমূহ উপস্থাপন করা হলো । রুকন এর পরেই ওয়াজিব এর স্থান, যা আবাশ্যিক। যা ইচ্ছাকৃতভাবে তরক(বাদ) করলে নামায বাতিল হয়ে যায় এবং ভূলক্রমে তরক করলে ‘সিজদায়ে সাহু’ দিতে হয়। নামাযের ওয়াজিব মোট ১৪টি।যথাঃ

১. সূরা ফাতিহা পাঠ করাঃ  ফরয নামাযের প্রথম দু’ রাক‘আতে এবং সকল প্রকার নামাযের প্রত্যেক রাকা‘আতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল সব ধরণের নামাযের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। এটাই ইমাম আবু হানিফা (রহতুল্লাহ আলাই) এর অভিমত। তবে ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহ আলাই)এটাকে ফরয হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তাঁর দলিল-
لاً صَلاَة لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَا تِحَةِ الْكِتاَبِ
“যে নামাযে ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামায হয়নি”  (বুখারী)

২. সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলানোঃ  ফরয নামাযসমূহের প্রথম দু’রাক’আতে সূরা ফাতিহার সাথে যেকোনো সূরা বা আয়াত মিলিয়ে পড়া কমপক্ষে বড় এক আয়াত বা ছোট তিন আয়াত পাঠ করা আবশ্যক।

৩. তারতীব মত নামায আদায় করাঃ  তারতীব অনুযায়ী নামায অর্থাৎ নামাযে যে সকল কাজ বারবার আসে ঐ কাজগুলোর ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা ওয়াজিব। যেমন রুকু, ও সিজদা যা নামাযের প্রতি রাক’আতে বারবার আসে। কিরা’আত পাঠ শেষ করে রুকু’ এবং রুকু শেষ করে উঠে সিজদা  করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে নামায নষ্ট হবে এবং নতুন করে নামায আদায় করতে হবে।

৪. প্রথম বৈঠকঃ  চার রাকা’আত ও তিন রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে দু রাকা’আত শেষ করে আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করতে যতটুকু সময় লাগে, সে পরিমাণ সময় পর্যন্ত বসে থাকা ওয়াজিব।

৫. আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করাঃ  নামাযের উভয় বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করা ওয়াজিব। আমরা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন, তুমি আত্তাহিয়্যাতু পড়। সুতরাং আলোচ্য হাদীসটিই প্রথম ও শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করা ওয়াজিব সাব্যস্ত করে।

৬. প্রকাশ্য কিরা’আত পাঠ করাঃ  যে সকল নামাযে প্রকাশ্য বা উচ্চঃস্বরে কিরা’আত পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে সেগুলোতে প্রকাশ্য কিরা’আত পাঠ করা ওয়াজিব। যেমন-ফজর, মাগরিব, ইশা, জুমু‘আ’ দু’ঈদের নামায ও তারাবীর নামায। অবশ্য একাকী আদায় করলে কিরা’আত উচ্চঃস্বরে পাঠ করা আবশ্যক নয়।

৭. চুপিসারে কিরা‘আত পাঠ করাঃ  যেমন নামাযে চুপে চুপে কিরা’আত পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে সেসব নামাযে নীরবে বা চুপে চুপে কিরা’আত পাঠ করা ওয়াজিব। যেমন- যোহর ও আসরের নামায।

৮. তা’দীলে আরকান বা ধীরস্থিরভাবে নামায আদায় করাঃ  নামাযের সব কাজ ধীরে-সুস্থে করতে হবে। যেমন রুকু’ ও সিজদা নিশ্চিত ও প্রশান্ত মনে তাড়াহুড়া না করে ভালোভাবে আস্তে আস্তে আদায় করা ওয়াজিব।

৯. রুকু’থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোঃ  অর্থাৎ রুকু’ শেষে সিজদা করার পূর্বে সোজা হয়ে দাঁড়ানো।

১০. সিজদা থেকে সোজা হয়ে বসাঃ  দু’ সিজদার মাঝখানে সোজা হয়ে বসা ওয়াজিব।

১১. সালাম বলাঃ  নামায শেষে “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ” বলে নামায শেষ করা। ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহ আলাই এর মতে এটি ফরজ।

১২. তারতীব ঠিক রাখাঃ  প্রত্যেক রাকা’আতের তারতীব বা ধারাবাহীকতা ঠিক রাখা অর্থাৎ আগের কাজ পেছনে এবং পেছনের কাজ আগে না করা।

১৩. দু’আ কুনুত পাঠ করাঃ  বেতরের নামাযে দু’আ কুনুত পাঠ করা ওয়াজিব।

১৪. ঈদের নামাযে তাকবীরঃ  দুই ঈদের নামযে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর বলা ওয়াজিব।

সূত্রঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামায, দারুস সালাম বাংলাদেশ

নামাজের সুন্নাত সমূহঃ


১। আজান ও ইকামত বলা।  (আদ্দুররুল মুখতার মাআ শামী-২/৪৮)

২। তাকবিরে তাহরিমার সময় উভয় হাত উঠানো।  (তানভীরুল আবসার মাআ শামী-২/১৮২)

৩। হাত উঠানোর সময় আঙ্গুলগুলি স্বাভাবিক রাখা।  (ফাতাওয়া শামী-২/১৭১)

৪। ইমামের জন্য তাকবীর গুলিউচ্চ স্বরে বলা।  (হিন্দিয়া-১/১৩০)

৫। সানা পড়া।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৭১)

৬। আউযুবিল্লাহ পড়া।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৭২)

৭। বিসমিল্লাহ পড়া।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৭৪)

৮। অনুচ্চস্বরে আমীন বলা।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৭৩)

৯। সানা,আউযুবিল্লাহ বিসমিল্লাহ,আমীন অনুচ্চস্বরে বলা।  (হিন্দিয়া-১৩১)

১০। হাত বাধার সময় বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা।  (হিন্দিয়া-১/১৩১)

১১। পুরুষের জন্য নাভির নিচে,আর মহিলার জন্য বুকের উপর হাত বাঁধা।  (হিন্দিয়া-১/১৩০)

১২। এক রোকন থেকে অন্য রোকনে যাবার সময় “আল্লাহু আকবার” বলা।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৮৩-৪৮৯)

১৩। একাকী নামাজ পাঠকারির জন্য রুকু থেকে উঠার সময় “সামিয়াল্লাহুলিমান হামিদা” ও “রব্বানা লাকাল হামদ” বলা। ইমামের জন্য শুধু “সামিয়া’ল্লাহু লিমান হামিদা” বলা আর মুক্তাদির জন্য শুধু “রব্বানা লাকাল হামদ” বলা।  (মারাকিল ফালাহ-২৭৮)

১৪। রুকুতে “সুবহানা রব্বিয়াল আযীম” বলা।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৭৮)

১৫। সেজদায় বলা “সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা”।  (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৯৪)

১৬। রুকুতে উভয় হাটু আকড়ে ধরা।   (বাদায়েউস সানায়ে- ১/৪৮৭)

১৭। রুকুতে পুরুষের জন্য উভয় হাতের আঙ্গুল ফাঁকা রাখা। আর মহিলার জন্য মিলিয়ে রাখা।  (শামী-২/১৭৩)

১৮। পুরুষের জন্য নামজে বসার সময় বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা ও ডান পা খাড়া রাখে আঙ্গুলগুলো কেব্লার দিক করে রাখা। আর মহিলার জন্য উভয় পা ডান দিকে বের করে জমিনের উপর বসা।  (বাদায়েউস সানায়ে-১/৪৯৬)

১৯। শেষ বৈঠকে তাশাহ্যুদের পর দুরুদ শরীফ পড়া।  (বাদায়েউস সানায়ে-১/৫০০)

২০। দুরুদের পর দোয়া পড়া।   (হিন্দিয়া-১/১৩০)

২১। তাশাহ্যুদে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার সময় শাহাদাত(তর্জনি) আঙ্গুল দ্বারা কেবলার দিকে ইশারা করা।   (বাদায়েউস সানায়ে-১/৫০১-৫০২)

নামাজের মুস্তাহাব সমূহঃ

১। দাঁড়ানো অবস্থায় সেজদার স্থানের দিকে, রুকু অবস্থায় উভয় পায়ের পাতার উপর, সেজদার সময় নাকের দিকে, বৈঠকের সময় কোলের দিকে দৃষ্টি রাখা।   (বাদায়েউস সানায়ে-১/৫০৩)

২। তাকবীরে তাহরিমা বলার সময় হাত চাদর থেকে বাহিরে বের করে রাখা।

৩। সালাম ফিরানোর সময় উভয় কাঁধের উপর দৃষ্টি রাখা।   (মারাকিল ফালাহ-১৫১)

৪। নামাজে মুস্তাহাব পরিমান ক্বেরাত( ফজর ও যোহরে তিওয়ালে মুফাস্যাল,সূরা হুজরাত থেকে সূরা বুরুজ পর্যন্ত।আছর ও ইশাতে আওসাতে মুফাস্যাল, সূরা তরেক থেকে বায়্যিনা পর্যন্ত। মাগরীবে কিসারে মুফাস্যাল সূরা যিলযাল থেকে শেষ পর্যন্ত।)পড়া।   (ফাতাওয়া শামী-২/২৬১)

৫। জুমআর দিন ফজরের নামাজে প্রথম রাকাতে সূরা আলিফ,লাম,মিম সেজদা ও দ্বিতীয় রাকাতে সূরা দাহর পড়া।   (ফাতাওয়া শামী-২/২৬৫)

৬। যথা সম্ভব কাঁশি ও ঢেকুর চেপে রাখা।   (ফাতাওয়া শামী-২/১৭৬)

৭। হাই আসলে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা।   (ফাতাওয়া শামী-২/১৭৭)

লেখকঃ মুফতি হাফিজ উদ্দীন,জামেয়াতুল আলআসাদ আল-ইসলামিয়া,ঢাকা

নামাজ মাকরূহ হওয়ার কারণঃ

১. নামাজরত অবস্থায় কাপড় বা শরীর নিয়ে খেলা করা মাকরূহ, যদি তা আমলে কাসীর না হয় আর আমলে কাসীর হলে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

২. সেজদার স্থান থেকে কংকর বা পাথরকণা সরানো (মাকরূহ)। অবশ্য সেজদা করা অসম্ভব হলে এক-দুইবার কংকর সরানোর অবকাশ আছে।

৩. আঙ্গুল সমূহকে মলা বা টেনে ফুটানো।

৪. কোমরে হাত রাখাও মাকরূহ।

৫. ডানে-বামে মুখ ফিরানোর দ্বারা যদি সিনা কেবলার দিক থেকে ফিরে যায় তাহলে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

আর যদি সিনা কেবলা দিক থেকে না ফিরে,  তাহলে নামাজ নষ্ট হবে না; অবশ্য নামাজ মাকরূহ হবে।

৬. উভয় হাটু খাড়া করে হাত মাটিতে রেখে নিতম্ব ও পায়ের উপর কুকুরের ন্যায় বসা।

৭. সেজদায় উভয় বাহুকে মাটিতে বিছিয়ে দেয়া।

৮. হাতের ইশারায় সালামের উত্তর দেয়া।

৯. ফরজ নামাজে বিনা ওজরে আসন করে বসা।

১০. মাটি লেগে যাওয়ার ভয়ে কাপড় হেফাযত করা।

১১. সদলে ছাওব করা অর্থাৎ কাপড় কাঁধে রেখে তার উভয় প্রান্ত একত্র না করে ঝুলিয়ে দেয়া।

১২. হাই তোলা। হাই ও হাচি যথাসম্ভব প্রতিহত করবে। না পারলে সমস্যা নেই।

১৩. শরীরের অলসতা দূর করার জন্য মোচড়ানো।

১৪. চোখ বন্ধ রাখা। অথচ দৃষ্টি সেজদার স্থানে রাখা উচিত।

১৫. চুল মাথার উপর ভাজ করে গিরা দিয়ে নামাজ পড়া। মাথায় চুল থাকলে নামাজের মধ্যে তা ছেড়ে রাখা সুন্নত যাতে চুলও সেজদা করতে পারে।

১৬. খোলা মাথায় নামাজ পড়া মাকরূহ। তবে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের নিমিত্তে এরূপ করলে মাকরূহ হবে না।

১৭. আয়াত ও তাসবীহসমূহ হাতে গণনা করা। তবে সাহেবাইন (রহ.)- এর মতে এটা মাকরূহ নয়।

১৮. শুধু ইমাম সাহেব মসজিদের মেহরাবে এবং সমস্ত লোক মেহরাবের বাইরে দাঁড়ানো।

১৯. ইমাম সাহেব একা উঁচু স্থানে এবং সমস্ত লোক নিচে দাঁড়ানো।

২০. কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পিছনে একা দাঁড়ানো।

তবে যদি সুযোগ না থাকে তাহলে (সামনের কাতার থেকে মাসআলা জানে এমন একজনকে টেনে এনে নিজের সাথে দাড় করাবে। তার পরও চেষ্টা করবেন একা শুধু কাতারে না দাঁড়াতে।

২১. মানুষ অথবা জন্তুর ছবি বিশিষ্ট কাপড় পরিধান করা।

২২. সামনে, বামে অথবা ডানে ছবি থাকাবস্থায় নামাজ মাকরূহ। তবে যদি ছবি পায়ের নিচে কিংবা পিছনে থাকে, তাহলে কোন ক্ষতি নেই।

 

নামায ভঙ্গের কারণসমূহঃ

নামায বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য যেমন কিছু শর্ত রয়েছে, তেমনিভাবে নষ্ট হওয়ার জন্যও কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। নিম্নোক্ত কারণে নামায নষ্ট হয়ে যায়। যথাঃ

১. সালামের জবাব দিলে : নামাযরত অবস্থায় কারো সালামের জবাব দিলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননা সালাম যিকিরের পর্যায়ভুক্ত নয়।

২. নামাযের মধ্যে সালাম দিলে : ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক নামাযের মধ্যে সালাম দিলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

৩. দুঃখসূচক শব্দ উচ্চারণ করা : নামাযের মধ্যে কেউ দুঃখসূচক শব্দ যেমন-আহ, উহ, হায় ইত্যাদি উচ্চস্বরে বললে নামায নষ্ট হয়ে যাবে।

৪. নামাযের ফরয ছুটে গেলেঃ নামাযের মধ্যে যেসব কাজ করা ফরয তন্মধ্যে কোনো একটি ফরয ছুটে গেলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

৫. কিরা’আতে ভুল করলে : নামাযের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াতে যদি এমন ভুল করে যে ভুলের কারণে আয়াতের মর্মার্থ ওলট পালট হয়ে যায়, তবে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

৬. নামাযে কিরা আত দেখে দেখে পড়া : নামাযরত ব্যক্তি যদি কুরআন শরীফ দেখে দেখে পাঠ করে, তবে তার নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

৭. নামাযের মধ্যে কথা বলাঃ নামায়ী ব্যক্তি যদি নামাযের মধ্যে কথা বলে, তাহলে তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে।
عن زيدِ بْنِ أْرْقَمَ، قال: ” كنَّا نتكلمُ فِي الصّلاةِ يُكَلِّمُ الرّجُلُ صَاِحِبَهَ وَهُوَ إلَى جَنْبِهِ فِي الصّلاةِ حَتّى نَزَلَتْ { وَقُوْمُوْا لِلهِ قاَ نِتِيْنَ } فاُمِرْنا بالسَّكُوْتِ, ونهينا عَنِ الْكَلَامِ
“যায়েদ ইবনে আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, (এক সময়) আমরা নামাযের মধ্যে কথা বলতাম। মুসল্লী নামাযের মধ্যে তার পার্শ্ববর্তী সাথীর সাথে কথা বলত। অতঃপর যখন কুরআনের বাণী “তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে দাঁড়াবে।”حَٰفِظُوا۟ عَلَى ٱلصَّلَوَٰتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلْوُسْطَىٰ وَقُومُوا۟ لِلَّهِ قَٰنِتِينَ   (সূরা বাকারাঃ২৩৮)
অবতীর্ণ হয়, তখন আমাদেরকে নীরবতা পালনের নির্দেশ দেয়া হয় এবং কথা বলতে নিষেধ করা হয়।”

৮. নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়লে : মাদকাসক্ত মাতাল অবস্থায় নামায আদায় করলে তা আদায় হবে না। কেননা, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন لا تقربوا الصلوۃ وانتم سکری“তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়ে না।”   ( সূরা নিসা,আয়াতঃ ৪৩)

৯. ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াজিব ছেড়ে দিলে : নামাযের মধ্যে নির্ধারিত ১৪টি ওয়াজিবের কোন একটি ওয়াজিব যদি নামাযী ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়, তবে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুটে গেলে সাহু সিজদা দিলে নামায শুদ্ধ হবে। কিন্তু সাহু সিজদা না দিলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। পুনরায় আদায় করতে হবে।

১০. অট্টহাসি দিলে : নামাযের মধ্যে অট্টহাসি দিলে শুধু নামাযই নয়, অজুও নষ্ট হয়ে যাবে।

১১. অপ্রাসঙ্গিক কিছু করা : কোনা দুঃসংবাদ শুনে ইন্নালিল্লাহ সুসংবাদ শুনে আল-হামদুলিল্লাহ’ এবং বিক্রয়ের সংবাদ শুনে “সুবহানাল্লাহ’ বললে নামায বিনষ্ট হয়ে যাবে।

১২. অন্য দিকে ঘুরে গেলেঃ নামাযের মধ্যে কিবলার দিক থেকে অন্য দিকে ফিরে গেলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

১৩. বাচ্চাকে দুধ পান করালে : নামাযরত স্ত্রীলোকের দুধ যদি তার সন্তান এসে খায়, তবে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

১৪. হাঁচির জবাব দেয়া : নামাযের মধ্যে যদি কেউ অন্যের হাঁচি শুনে ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে হাঁচির জবাব দেয়, তবে তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে।

১৫. চলাফেরা করলে : নামাযের মধ্যে চলাফেরা করলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। হ্যাঁ, প্রয়োজনে সম্মুখে বা পেছনে যাওয়া যাবে।

১৬. অপবিত্র স্থানে সিজদা করলে : অপবিত্র স্থানে সিজদা করলে নামায নষ্ট হয়ে

১৭. আমলে কাসীর হলে : নামাযের মধ্যে যদি কেউ আমলে কাসীর করে তবে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। আমলে কাসীর হলো নামাযের মধ্যে এমন আমল করা যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যে, লোকটি নামায আদায় করছে না।

১৮. নিজের ইমাম ছাড়া অন্যকে লোকমা দেয়া : যদি কেউ নামাযের মধ্যে নিজের ইমাম ছাড়া অন্য কাউকে লোকমা দেয়, অথবা ইমাম যদি মুক্তাদি ব্যতীত অন্য কারো লোকমা নেয় অথবা ইমাম যদি জামাত বহির্ভূত অন্য কারো ভুল সংশোধন গ্রহণ করে তবে তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে।

১৯. নামাজে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলাঃ এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছেঃ
عنْ مُعَا وِيةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّاَمِى. قاَلَ : قاَلَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إنَّ هذه الصلاة لا يصلُحُ فيها شيْءٌ من كلامِ النَّاسِ , إنّما هو التسبيح و التكبير وقراءةُ القران.
“হযরত মুয়াবিয়া বিন হাকাম সুলামী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নামাযে দুনিয়ার কোনো ব্যক্তিগত কথা বলা চলবে না বরং নামায তিলাওয়াতের সমষ্টি মাত্র।”   (মুসলিমঃ ৫৩৭)

২০. নামাযে কাতার সোজা না করে নামায পড়া
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছ
عن أبى مسعود، قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم  يمسح  مناكبنا في الصّلاة، ويقول: أستووا، ولا تختلفوا، فتختلف قلوبكم.
হযরত আবু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়ানোর সময় আমাদের কাঁধগুলো স্পর্শ করে বলতেন: তোমরা সবাই নামাযের কাতারে একদম সোজা হয়ে দাড়াও । একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনো দাড়িও না, তা হলে তোমাদের অন্তরগুলোর মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হবে।   (মুসলিম,হাদিসঃ ৪৩২)

২১. বিনা অজুতে নামায পড়া
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছেঃ
عن أبو هريرة، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا تقبل صلاة أحد كم  إذا أحدث حتى يتوضّاَ.
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কারো অজু না থাকা সত্ত্বেও অজু না করে নামায পড়লে তার নামায কবুল হবে না।  (মুসলিম,হাদিসঃ ২২৫)

২২. অন্যান্য : কোনো পত্র বা লেখার প্রতি দৃষ্টি পড়ায় তা মুখে উচ্চারণ করলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।

২৩. তিন তাসবীহ পাঠ পরিমাণ সময় সতর খুলে থাকা ।

২৪. নামাযে খাওয়া বা পান করা ।

 

সূত্রঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর নামায,দারুস সালাল বাংলাদেশ।


‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

Leave a Reply