Thursday, June 11
Shadow

সূরা আন নাস অর্থ, নামকরণ, শানে নুযূল, পটভূমি ও বিষয়বস্তু

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

নামকরণ :

কুরআন মজীদের এ শেষ সূরা দু’টি আলাদ আলাদা সূরা ঠিকই এবং মূল লিপিতে এ সূরা দু’টি ভিন্ন ভিন্ন নামেই লিখিত হয়েছে , কিন্তু এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত গভীর এবং উভয়ের বিষয়বস্তু পরস্পরের সাথে এত বেশী নিকট সম্পর্ক রাখে যার ফলে এদের একটি যুক্ত নাম “ মু’আওবিযাতাইন ” ( আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দু’টি সূরা ) রাখা হয়েছে । ইমাম বায়হাকী তাঁর “ দালায়েলে নবুওয়াত ” বইতে লিখেছেন : এ সূরা দু’টি নাযিলও হয়েছে একই সাথে । তাই উভয়ের যুক্তনাম রাখা হয়েছে “ মু’আওবিযাতাইন ” । আমরা এখানে উভয়ের জন্য একটি সাধারণ ভূমিকা লিখছি। কারণ , এদের উভয়ের সাথে সম্পর্কিত বিষয়বলী ও বক্তব্য সম্পূর্ণ একই পর্যায়ভুক্ত । তবে ভূমিকায় একত্র করার পর সামনের দিকে প্রত্যেকের আলাদা ব্যাখ্যা করা হবে।

নাযিলের সময় – কাল

হযরত হাসান বসরী , ইকরামা , আতা ও জাবের ইবনে যায়েদ বলেন , এ সূরা দু’টি মক্কী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকেও এ ধরনের একটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর অন্য একটি বর্ণনায় একে মাদানী বলা হয়েছে । আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা) ও কাতাদাহও একই উক্তি করেছেন। যে সমস্ত হাদীস এ দ্বিতীয় বক্তব্যটিকে শক্তিশালী করে তার মধ্যে মুসলিম , তিরমিযী , নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বলে হযরত উকবা ইবন আমের (রা) বর্ণিত একটি হাদীস হচ্ছে : একদির রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেন :

আরবী ——————————————————————————-

“ তোমরা কি কোন খবর রাখো , আজ রাতে আমার ওপর কেমন ধরনের আয়াত নাযিল হয়েছে ? নজীরবিহীন আয়াত ! কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক এবং কুল আউযু বিরব্বিন নাস ।”

হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) হিজরাতের পরে মদীনা তাইয়েবায় ইসলাম গ্রহণ করেন বলেই এ হাদীসের ভিত্তিতে এ সূরা দু’টিকে মদানী বলার যৌক্তিকতা দেখা দেয়। আবু দাউদ ও নাসাঈ তাদের বর্ণনায় একথাই বিবৃত করেছেন। অন্য যে রেওয়ায়াতগুলো এ বক্তব্যকে শক্তিশালী করেছে সেগুলো ইবনে সা’দ , মুহিউস সুন্নাহ বাগাবী , ইমাম নাসাঈ , ইমাম বায়হাকী , হাফেজ ইবনে হাজার , হাফেজ বদরুদ্দীন আইনী , আবদ ইবনে হুমায়েদ এবং আরো অনেকে উদ্ধৃত করেছেন। সেগুলোতে বলা হয়েছে : ইহুদিরা যখন মদীনায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যাদু করেছিল এবং তার প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন এ সূরা নাযিল হয়েছিল। ইবনে সাদ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন , এটি সপ্তম হিজরীর ঘটনা। এরই ভিত্তিতে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাও এ সূরা দু’টিকে মাদানী বলেছেন।

কিন্তু ইতিপূর্বে সূরা ইখলাসের ভূমিকায় আমরা বলেছি , কোন সূরা বা আয়াত সম্পর্কে যখন বলা হয় , উমুক সময় সেটি নাযিল হয়েছিল। তখন এর অর্থ নিশ্চিতভাবে এ হয় না যে , সেটি প্রথমবার ঐ সময় নাযিল হয়েছিল। বরং অনেক সময় এমন ও হয়েছে , একটি সূরা বা আয়াত প্রথমে নাযিল হয়েছিল , তারপর কোন বিশেষ ঘটনা বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পুনর্বার তারই প্রতি বরং কখনো কখনো বারবার তার প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়েছিল। আমাদের মতে সূরা নাস ও সূরা ফালাকের ব্যাপাটিও এ রকমের । এদের বিষয়বস্তু পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে , প্রথমে মক্কায় এমন এক সময় সূরা দু’টি নাযিল হয়েছিল যখন সেখানে নবী করীমের ( সা) বিরোধিতা জোরেশোরে শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন মদীনা তাইয়েবায় মুনাফিক , ইহুদি ও মুশরিকদের বিপুল বিরোধিতা শুরু হলো , তখন তাঁকে আবার ঐ সূরা দু’টি পড়ার নির্দেশ দেয়া হলো । ওপরে উল্লেখিত হযরত উকবা ইবনে আমেরের (রা) রেওয়ায়াতে একথাই বলা হয়েছে। তারপর যখন তাঁকে যাদু করা হলো এবং তাঁর মানসিক অসুস্থতা বেশ বেড়ে গেলো তখন আল্লাহর হুকুমে জিব্রীল আলাইহিস সালাম এসে আবার তাঁকে এ সূরা দু’টি পড়ার হুকুম দিলেন । তাই আমাদের মতে যেসব মুফাসসির এ সূরা দু’টিকে মক্কী গণ্য করেন তাদের বর্ণনাই বেশী নির্ভরযোগ্য। সূরা ফালাকের শুধুমাত্র একটি আয়াত ( আরবী —————————-) যাদুর সাথে সম্পর্ক রাখে , এ ছাড়া আল ফালাকের বাকি সমস্ত আয়াত এবং সূরা নাসের সবকটি আয়াত এ ব্যাপারে সরাসরি কোন সম্পর্ক রাখে না। যাদুর ঘটনার সাথে এ সূরা দু’টিকে সম্পর্কিত করার পথে এটিও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

মক্কা মু’আয্‌যমায় এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে এ সূরা দু’টি নাযিল হয়েছিল। তখন ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই মনে হচ্ছিল , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেন ভীমরুলের চাকে হাত দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর দাওয়াত যতই বিস্তার লাভ করতে থেকেছে কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের বিরোধিতাও ততোই বেড়ে যেতে থেকেছে। যতদিন তাদের আশা ছিল কোনরকম দেয়া-নেয়া করে অথবা ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে তাঁকে ইসলামী দাওয়াতের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারা যাবে , ততদিন তো বিদ্বেষ ও শত্রুতার তীব্রতার কিছুটা কমতি ছিল। কিন্তু নবী করীম (সা) যখন দীনের ব্যাপারে তাদের সাথে কোন প্রকার আপোষ রফা করার প্রশ্নে তাদেরকে সম্পূর্ণ নিরাশ করে দিলেন এবং সূরা আল কাফেরুনে তাদেরকে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলে দিলেন — যাদের বন্দেগী তোমরা করছো আমি তার বন্দেগী করবো না এবং আমি যার বন্দেগী করছি তোমরা তার বন্দেগী করো না , কাজেই আমার পথ আলাদা এবং তোমাদের পথ ও আলাদা — তখন কাফেরদের শত্রুতা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব পরিবারের ব্যক্তিবর্গ ( পুরুষ-নারী , ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে) ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের মনে তো নবী করীমের (সা) বিরুদ্ধে সবসময় তুষের আগুন জ্বলছিল। ঘরে ঘরে তাঁকে অভিশাপ দেয়া হচ্ছিল। কোন দিন রাতের আঁধারে লুকিয়ে তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। যাতে বনী হাশেমদের কেউ হত্যাকরীর সন্ধান পেয়ে আবার প্রতিশোধ নিতে না পারে এ জন্য এ ধরনের পরামর্শ চলছিল। তাঁকে যাদু – টোনা করা ‌হচ্ছিল। এভাবে তাঁকে মেরে ফেলার বা কঠিন রোগে আক্রান্ত করার অথবা পাগল করে দেয়ার অভিপ্রায় ছিল। জিন ও মানুষদের মধ্যকার শয়তানা সব দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা চাচ্ছিল জিন মানুষের মনে তাঁর এবং তিনি যে দীন তথা জীবন বিধান কুরআন এনেছেন তার বিরুদ্ধে কোন না কোন সংশয় সৃষ্টি করতে। এর ফলে লোকেরা তাঁর প্রতি বিরূপ ধারণা করে দূরে সরে যাবে বলে তারা মনে করছিল। অনেক লোকেরা মনে হিংসার আগুন জ্বলছিল। কারণ তারা নিজেদের ছাড়া বা নিজেদের গোত্রের লোকদের ছাড়া আর কারো প্রদীপের আলো জ্বলতে দেখতে পারতো না। উদাহরণ স্বরূপ , আবু জেহেল যে কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতায় সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেটি ছিল তার নিজের ভাষায় : “ আমাদের ও বনী আবদে মান্নাফের ( তথা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার ) মধ্যে ছিল পারস্পরিক প্রতিযোগিতা । তারা মানুষকে আহার করিয়েছে , আমরা ও আহার করিয়েছি । তারা লোকদেরকে সওয়ারী দিয়েছে , আমরা ও দিয়েছি। তারা দান করেছে , আমরাও দান করেছি। এমন কি তারা ও আমরা মান মর্যাদার দৌঁড়ে সামনে সমান হয়ে গেছি। এখন তারা বলছে কি , আমাদের মধ্যে একজন নবী আছে , তার কাছে আকাশ থেকে অহী আসে। আচ্ছ , এখন কি এ ক্ষেত্রে আমরা তাদের সাথে কেমন করে মোকাবেলা করতে পারি ? আল্লাহর কসম , আমরা কখনো তাকে মেনে নেবো না এবং তার সত্যতার স্বীকৃতি দেবো না। ” ( ইবনে হিশাম , প্রথম খণ্ড , ৩৩৭-৩৩৮ পৃষ্ঠা )

এহেন অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হয়েছে : এদেরকে বলে দাও আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকাল বেলার রবের , সমুদয় সৃষ্টির দুষ্কৃতি ও অনিষ্ট থেকে , রাতের আঁধার থেকে যাদুকর ও যাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকদের দৃষ্কৃতি থেকে । আর এদেরকে বলে দাও , আমি আশ্রয় চাচ্ছি সমস্ত মানুষের রব , সমস্ত মানুষের বাদশা ও সমস্ত মানুষের মাবুদের কাছে। এমন প্রত্যেটি সন্দেহ ও প্ররোচনা সৃষ্টিকারীর অনিষ্ট থেকে যা বার বার ঘুরে ফিরে আসে এবং মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে ও তাদেরকে প্ররোচিত করে । তারা জিন শয়তানদের মধ্য থেকে হতে পারে , আবার মানুষ শয়তানদের মধ্য থেকেও হতে পারে। এটা হযরত মূসার ( আ) ঠিক সেই সময়ের কথার মতো যখন ফেরাউন ভরা দরবারে তাঁকে হত্যা করার সংকল্প প্রকাশ করেছিল। হযরত মূসা তখন বলেছিলেন :

আরবী —————————————————————————–

“ আমি নিজের ও তোমাদের রবের আশ্রয় নিয়েছি এমন ধরনের প্রত্যেক দাম্ভিকের মোকাবেলায় যে হিসেবের দিনের প্রতি ঈমান রাখে না। ” ( আল মু’মিন , ২৭)

আরবী —————————————————————————-

“ আর তোমরা আমর ওপর আক্রমণ করবে এ জন্য আমি নিজের ও তোমাদের রবের আশ্রয় নিয়েছি। ” ( আদ দুখান, ২০)

উভয় স্থানেই আল্লাহর এ মহান মর্যাদা সম্পন্ন পয়গম্বরদের নিতান্ত সহায় সম্বলহীন অবস্থায় বিপুল উপায় উপকরণ ও ক্ষমতা- প্রতিপত্তির অধিকারীদের সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছিল। উভয় স্থানেই শক্তিশালী দুশমনদের সামনে তাঁরা নিজেদের সত্যের দাওয়াত নিয়ে অবিচল দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। অথচ দুশমনদের মোকাবেলা করার মতো কোন বস্তুগত শক্তি তাদের ছিল না। উভয় স্থানেই তাঁরা “ তোমাদের মোকাবেলায় আমরা বিশ্ব – জাহানের রবের আশ্রয় নিয়েছি ” এই বলে দুশমনদের হুমকি -ধমকি মারাত্মক বিপজ্জনক কূট কৌশল ও শত্রুতামূলক চক্রান্ত উপেক্ষা করে গেছেন। মূলত যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে , আল্লাহর শক্তি সব শক্তির সেরা , তাঁর মোকাবেলায় দুনিয়ার সব শক্তি তুচ্ছ এবং যে ব্যক্তি তাঁর আশ্রয় নিয়েছে তার সামান্যতম ক্ষতি করার ক্ষমতাও কারো নেই। একমাত্র সেই ব্যক্তিই এ ধরনের অবিচলতা , দৃঢ় সংকল্প ও উন্নত মনোবলের পরিচয় দিতে পারে এবং সে -ই একথা বলতে পারে : সত্যের বাণী ঘোষণার পথ থেকে আমি কখনই বিচ্যুত হবো না। তোমাদের যা ইচ্ছা করে যাও । আমি তার কোন পরোয়া করি না। কারণ আমি তোমাদের ও আমার নিজের এবং সারা বিশ্ব – জাহানের রবের আশ্রয় নিয়েছি।

এ সূরা দু’টি কুরআনের অংশ কিনা

এ সূরা দু’টির বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য অনুধাবন করার জন্য ওপরের আলোচনাটুকুই যথেষ্ট। তবুও হাদীস ও তাফসীর গ্রন্থগুলোয় এদের সম্পর্কে এমন তিনটি বিষয়ের আলোচনা এসেছে যা মনে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে , তাই আমরা সে ব্যাপারটিও পরিষ্কার করে দিতে চাই। এর মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় সেটি হচ্ছে , এ সূরা দু’টির কুরআনের অংশ হবার ব্যাপারটি কি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অথবা এর মধ্যে কোন প্রকার সংশয়ের অবকাশ আছে ? এ প্রশ্ন দেখা দেবার কারণ হচ্ছে এই যে , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতো উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী থেকে বিভিন্ন রেওয়ায়াতে একথা উদ্ধৃত হয়েছে যে , তিনি এ সূরা দু’টিকে কুরআনের সূরা বলে মানতেন না এবং নিজের পাণ্ডুলিপিতে তিনি এ দু’টি সূরা সংযোজিত করেননি। ইমাম আহমাদ , বাযযার , তাবারানী , ইবনে মারদুইয়া , আবু ইয়ালা , আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বল , হুমাইদী , আবু নু’আইয , ইবনে হিব্বান প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন সূত্রে এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সহীহ সনদের মাধ্যমে একথা হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীসগুলোতে কেবল একথাই বলা হয়নি যে , তিনি এই সূরা দু’টিকে কুরআনের পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দিতেন বরং এই সাথে একথাও বলা হয়েছে যে , তিনি বলতেন : “ কুরআনের সাথে এমন জিনিস মিশিয়ে ফেলো না যা কুরআনের অংশ নয়। এ সূরা দু’টি কুরআনের অন্তরভুক্ত নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এর মাধ্যমে একটি হুকুম দেয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল , এ শব্দগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।” কোন কোন রেওয়ায়াতে আরো বাড়তি বলা হয়েছে যে , তিনি নামাযে এ সূরা দু’টি পড়তেন না।

এ রেওয়ায়াতগুলোর কারণে ইসলাম বিরোধীরা কুরআনের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টির এবং ( নাউযুবিল্লাহ ) কুরআন যে বিকৃতিমুক্ত নয় একথা বলার সুযোগ পেয়ে গেছে। বরং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) মতো বড় সাহাবী যখন এই মত পোষণ করছেন যে , কুরআনের এ দু’টি সূরা বাইর থেকে তাতে সংযোজিত হয়েছে তখন না জানি তার মধ্যে আরো কত কি পরিবর্তন – পরিবর্ধন করা হয়েছে। এ ধরনের সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ তার সহজেই পেয়ে গেছে। কুরআনকে এ ধরনের দোষারোপ মুক্ত করার জন্য কাযী আবু বকর বাকেল্লানী ও কাযী ইয়ায ইবনে মাসউদের বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন , ইবনে মাসউদ সূরা ফালাক ও সূরা নাসের কুরআনের অংশ হবার ব্যাপারটি অস্বীকার করতেন না বরং তিনি শুধু এ সূরা দু’টিকে কুরআনের পাতায় লিখে রাখতে অস্বীকার করতেন। কারণ তাঁর মতে কুরআনের পাতায় শুধুমাত্র তাই লিখে রাখা উচিত যা লিখার অনুমতি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছিলেন । কিন্তু তাদের এ জবাব ও ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কারণ ইবনে মাসউদ (রা) এ সূরা দু’টির কুরআনের সূরা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন , একথা নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে প্রমাণিত । ইমাম নববী , ইমাম ইবনে হাযম , ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী প্রমুখ অন্য কতিপয় মনীষী ইবনে মাসউদ যে এ ধরনের কোন কথা বলেছেন , একথাটিকেই সরাসরি মিথ্যা ও বাতিল গণ্য করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সত্যকে সনদ ছাড়াই রদ করে দেয়া কোন সুস্থ জ্ঞানসম্মত পদ্ধতি নয়।

এখন প্রশ্ন থেকে যায় , ইবনে মাসউদ (রা) সংক্রান্ত এ রেওয়ায়াত থেকে কুরআনের প্রতি যে দোষারোপ হচ্ছে তার জবাব কি ? এ প্রশ্নের কয়েকটি জবাব আমরা এখানে পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করেছি।

এক : হাফেয বাযযার তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে ইবনে মাসউদ (রা) সংক্রান্ত এ রেওয়ায়াতগুলো বর্ণনা করার পর লিখেছেন : নিজের এ রায়ের ব্যাপারে তিনি একান্তই নিঃসংগ ও একাকী। সাহাবীদের একজনও তাঁর এ বক্তব্য সমর্থন করেননি।

দুই : সকল সাহাবী একমত হওয়ার ভিত্তিতে তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরআন মজীদের যে অনুলিপি তৈরি করেছিলেন এবং ইসলামী খেলাফতের পক্ষ থেকে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রে সরকারী পর্যায়ে পঠিয়েছিলেন তাতে এ দু’টি সূরা লিপিবদ্ধ ছিল।

তিন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুবারক যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সমগ্র ইসলামী দুনিয়ায় কুরআনের যে কপির ওপর সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একমত তাতেই সূরা দু’টি লিখিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদের (রা) একক রায় তাঁর বিপুল ও উচ্চ মর্যাদা সত্ত্বেও সমগ্র উম্মাতের এ মহান ইজমার মোকাবেলায় কোন মূল্যই রাখে না।

চার : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে অত্যন্ত নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হাদীস অনুযায়ী একথা প্রমাণিত হয় যে , তিনি নামাযে এ সূরা দু’টি নিজে পড়তেন , অন্যদের পড়ার আদেশ দিতেন এবং কুরআনের সূরা হিসেবেই লোকদেরকে এ দু’টির শিক্ষা দিতেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নোক্ত হাদীসগুলো দেখুন।

ইতিপূর্বে মুসলিম , আহমাদ , তিরমিযী ও নাসাঈর বরাত দিয়ে আমরা হযরত উকবা ইবনে আমেরের (রা) একটি রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছি। এতে রসূলুল্লাহ (সা) সূরা ফালাক ও সূরা নাস সম্পর্কে তাঁকে বলেন : আজ রাতে এ আয়াতগুলো আমার ওপর নাযিল হয়েছে। উকবা ইবনে আমরে (রা) থেকে বর্ণিত নাসায়ীর এক রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দু’টি সূরা ফজরের নামাযে পড়েন । ইবনে হিব্বানও এই হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) থেকে রেওয়ায়াত করেছেন , নবী করীম (সা) তাঁকে বলেন : “ যদি সম্ভব হয় তোমার নামাযসমূহ থেকে এ সূরা দু’টির পড়া যেন বাদ না যায়। ” সাঈদ ইবনে মনসুর হযরত মু’আয ইবনে জাবালের রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন । তাতে বলা হয়েছে , নবী করিম (সা) ফজরের নামাযে এ সূরা দু’টি পড়েন। ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে সহীহ সনদ সহকারে আরো একজন সাহাবীর হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে , নবী (সা) তাঁকে বলেন : যখন তুমি নামায পড়বে , তাতে এ দু’টি সূরা পড়তে থাকবে। মুসনাদে আহমাদ , আবু দাউদ ও নাসাঈতে উকবা ইবনে আমেরের (রা) একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন : “ লোকেরা যে সূরাগুলো পড়ে তার মধ্যে সর্বোত্তম দু’টি সূরা কি তোমাকে শেখাবো না ? তিনি আরজ করেন , অবশ্যি শিখাবেন। হে আল্লাহ রসূল ! একথায় তিনি তাকে এ আল ফালাক ও আন নাস সূরা দু’টি পড়ান। তারপর নামায দাঁড়িয়ে যায় এবং নবী করীম (সা) এ সূরা দু’টি তাতে পড়েন। নাময শেষ করে তিনি তার কাছ দিয়ে যাবার সময় বলেন : “ হে উকাব ( উকবা) ! কেমন দেখলে তুমি ?” এরপর তাকে হিদায়াত দিলেন , যখন তুমি ঘুমাতে যাও এবং যখন ঘুম থেকে জেগে উঠো তখন এ সূরা দু’টি পড়ো। মুসনাদে আহামদ , আবু দাউদ তিরমিযী , নাসাঈতে উকবা ইবনে আমেরের (রা) অন্য একটি রেওয়ায়াত বলা হয়েছে : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে প্রত্যেক নামাযের পর “ মুআওবিযাত ” (অর্থাৎ সূরা ইখলাস , সূরা আল ফালাক ও সূরা আন নাস ) পড়তে বলেন । নাসায়ী ইবনে মারদুইয়ার এবং হাকেম উকবা ইবনে আমেরের আর একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে : একবার নবী করিম (সা) সওয়ারীর পিঠে চড়ে যাচ্ছিলেন এবং আমি তাঁর পবিত্র পায়ে হাত রেখে সাথে সাথে যাচ্ছিলাম। আমি বললাম , আমাকে কি সূরা হূদ সূরা ইউসুফ শিখিয়ে দেবেন ? বললেন : “আল্লাহর কাছে বান্দার জন্য ‘ কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক – এর চাইতে বেশী বেশী উপকারী আর কোন জিনিস নেই। ” নাসাঈ , বায়হাকী , বাগাবী ও ইবনে সা’দ আবদুল্লাহ ইবনে আবেস আল জুহানীর রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে , নবী করিম (সা) আমাকে বলেছেন : “ইবনে আবেস , আমি কি তোমাকে জানাবো না , আশ্রয় প্রার্থীরা যতগুলো জিনিসের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কোনগুলো ?” আমি বললাম , অবশ্যি বলবেন হে আল্লাহর রসূল ! বললেন : “ কূল আউযু বিরব্বিল ফালাক ” ও “ কুল আউযু বিরব্বিন নাস ” সূরা দু’টি । ” ইবনে মারদুইয়া হযরত ইবনে সালমার রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে : “ আল্লাহ যে সূরাগুলো সবচেয়ে বেশী পছন্দ করেন তা হচ্ছে ” , কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক ও কুল আউযু বিরব্বিন নাস।”

এখানে প্রশ্ন দেখা যায় , এ দু’টি কুরআনে মজীদের সূরা নয় , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এ ধরনের ভুল ধারণার শিকার হলেন কেমন করে ? দু’টি বর্ণনা একত্র করে দেখলে আমরা এর জবাব পেতে পারি।

একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলতেন , এটিতো আল্লাহর একটি হুকুম ছিল । রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হুকুম দেয়া হয়েছিল , আপনি এভাবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। অন্য বর্ণনাটি বিভিন্ন সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম বুখারী সহীহ আল বুখারীতে , ইমাম মুহাম্মাদ তাঁর মুসনাদে , হাফেজ আবু বকর আল হুমাইদী তাঁর মুসনাদে , আবু নু’আইম তাঁর আল মুসতাখরাজে এবং নাসাঈ তাঁর সুনানে যির ইবনে জুবাইশের বরাত দিয়ে সামান্য শাব্দিক পরিবর্তন সহকারে কুরাআনী জ্ঞানের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী হযরত উবাই ই‌বনে কা’ব থেকে এটি উদ্ধৃত করেছেন। যির ইবনে হুবাইশ বর্ণনা করেছেন , আমি হযরত উবাইকে (রা) বললাম , আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ তো এমন এমন কথা বলেন । তাঁর এ উক্তি সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি ? তিনি জবাব দিলেন : “ আমি এ সম্পর্কে রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন , আমাকে বলা হয়েছে , ‘ কুল ’ (বলো ) , কাজেই আমি বলেছি ‘কুল’ । তাই আমরাও তেমনিভাবে বলি যেভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন। ” ইমাম আহমাদের বর্ণনা মতে হযরত উবাইয়ের বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ : “ আমি সাক্ষদিচ্ছি , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাম আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন , জিব্রীল আলাইহি ওয়া সালাম তাঁকে বলেছিলেন , কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক ” তাই তিনিও তেমনি বলেন । আর জিব্রীল ( আ) ‘ কুল আউযু বিরব্বিন নাস ’ বলেছিলেন , তাই তিনি ও তেমনি বলেন । কাজেই রসূল (সা) যেভাবে বলতেন আমরাও তেমনি বলি। ” এ দু’টি বর্ণনা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) উভয় সূরায় ‘ কুল’ (বলো ) শব্দ দেখে এ ভুল ধারণা করেছিলেন যে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে “ আউযু বিরব্বিল ফালাক ( আমি সকাল বেলার রবের আশ্রয় চাচ্ছি ) ও “ আউযু বিরব্বিন নাস ” ( আমি সমস্ত মানুষের রবের আশ্রয় চাচ্ছি ) বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি রসূলে করিমকে ( সা) এর এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। হযরত উবাই ইবনে কা’বের (রা) মনে এ সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছিল। তিনি রসূলের (সা) সামনে প্রশ্ন রেখেছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন : জিব্রীল আলাইহিস সালাম যেহেতু ‘ কুল’ বলেছিলেন তাই আমি ও ‘কুল’ বলি। একথাটিকে এভাবে ও ধরা যায় যদি কাউকে হুকুম দেয়ার উদ্দেশ্য থাকে এবং তাকে বলা হয় , , “ বলো , আমি আশ্রয় চাচ্ছি।” বরং সে ক্ষেত্রে ‘ বলো ’ শব্দটি বাদ দিয়ে “ আমি আশ্রয় চাচ্ছি’ বলবে। বিপরীত পক্ষে যদি উর্ধতন শাসকের সংবাদবাহক কাউকে এভাবে খবর দেয় , “ বলো , আমি আশ্রয় চাচ্ছি” এবং এ পয়গাম তার নিজের কাছে রেখে দেবার জন্য নয় বরং অন্যদের কাছেও পৌঁছে দেবার জন্য দেয়া হয়ে থাকে , তাহলে তিনি লোকদের কাছে এ পয়গামের শব্দগুলো , হুবহু পৌঁছে দেবেন । এর মধ্য থেকে কোন একটি শব্দ বাদ দেবার অধিকার তাঁর থাকবে না। কাজেই এ সূরা দু’টির সূচনা ‘ কুল’ শব্দ দিয়ে করা একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে , এটি অহীর কালাম এবং কালামটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যেভাবে নাযিল হয়েছিল ঠিক সেভাবেই লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি বাধ্য ছিলেন। এটি শুধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া একটি হুকুম ছিল না। কুরআন মজীদে এ দু’টি সূরা ছাড়াও এমন ৩৩০ টি আয়াত আছে যেগুলো ‘কুল’ শব্দ দিয়ে শুরু করা হয়েছে। এ আয়াতগুলোতে ‘কুল’ ( বলো ) থাকা একথাই সাক্ষ্য বহন করে যে , এগুলো অহীর কালাম এবং যেসব শব্দ সহকারে এগুলো নবী করিম (সা) — এর ওপর নাযিল হয়েছিল হুবুহু সেই শব্দগুলো সহকারে লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া তাঁর জন্য ফরয করা হয়েছিল। নয়তো প্রত্যেক জায়গায় ‘কুল’ (বলো ) শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু সেই শব্দগুলোই বলতেন যেগুলো বলার হুকুম তাঁকে দেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি এগুলো কুরআনে সংযোজিত করতেন না। বরং এ হুকুমটি পালন করার জন্য শুধু মাত্র সেই কথাগুলোই বলে দেয়া যথেষ্ট মনে করতেন যেগুলো বলার হুকুম তাঁকে দেয়া হয়েছিল।

এখানে সামান্য একটু চিন্তা ভাবনা করলে একথা ভালোভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে যে , সাহাবায়ে কেরামকে ভুল ত্রুটি মুক্ত মনে করা এবং তাদের কোন কথা সম্পর্কে ‘ ভুল’ শব্দটি শুনার সাথে সাথেই সাহাবীদের অবমাননা করা হয়েছে বলে হৈ চৈ শুরু করে দেয়া কতইনা অর্থহীন। এখানে দেখা যাচ্ছে , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) – এর মত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীর কুরআনের দু’টি সূরা সম্পর্কে কত বড় একটি ভুল হয়ে গেছে। এতবড় উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীর যদি এমনি একটি ভুল হয়ে যেতে পারে তাহলে অন্যদেরও কোন ভুল হয়ে যাওয়া সম্ভব । আমরা ইলমী তথা তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য এ ব্যাপারে যাচাই – বাছা‌ই করতে পারি। তবে যে ব্যক্তি ভুলকে ভুল বলার পর আবার সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁদের প্রতি ধিক্কার ও নিন্দাবাদে মুখর হবে সে হবে একজন মস্তবড় জালেম। এ “ মু’আওবিযাতাইন ” প্রসংগে মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ হযরত ইবনে মসাউদ (রা) এর রায়কে ভুল বলেছেন। কিন্তু তাঁদের কেউই কথা বলার দুঃসাহস করেননি যে , ( নাউযুবিল্লাহ) কুরআনের দু’টি সূরা অস্বীকার করে তিনি কাফের হয়ে গিয়েছিলেন।

নবী করীমের (সা) ওপর যাদুর প্রভাব

এ সূরাটির ব্যাপারে আরেকটি প্রশ্ন দেখা । হাদীস থেকে জানা যায় , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যাদু করা হয়েছিল। তার প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এ যাদুর প্রভাব দূর করার জন্য জিব্রীল আলাইহিস সালাম এসে তাঁকে এ সূরা দু’টি পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন । প্রাচীন ও আধুনিক বুদ্ধিবাদীদের অনেকে এ ব্যাপারটির বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করেছেন। তাঁরা বলেছেন , এ হাদীসগুলো মেনে নিলে সমস্ত শরীয়াতটাই সন্দেহযুক্ত হয়ে যায়। কারণ , নবীর ওপর যদি যাদুর প্রভাব পড়তে পারে এবং এ হাদীসগুলোর দৃষ্টিতে তাঁর ওপর যাদুর প্রভাব পড়েছিল , তাহলে আমরা জানি না বিরোধীরা যাদুর প্রভাব ফেলে তাঁর মুখ থেকে কতো কথা বলিয়ে এবং তাঁকে দিয়ে কত কাজ করিয়ে নিয়েছে। আর তাঁর প্রদত্ত শিক্ষার মধ্যেইবা কি পরিমাণ জিনিস আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং কতটা যাদুর প্রভাবে ছিল তাও আমরা জানি না। বরং তাদের বক্তব্য হচ্ছে , একথা সত্য বলে মেনে নেয়ার পর যাদুরই মাধ্যমে নবীকে নবুওয়াতের দাবী করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল কি না এবং যাদুরই প্রভাবে তিনি বিভ্রান্তির শিকার হয়ে তাঁর কাছে ফেরেশতা এসেছে বলে মনে করেছিলেন কিনা একথাও নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে না। তাদের আরো যুক্তি হচ্ছে , এ হাদীসগুলো কুরআন মজীদের সাথে সংঘর্ষশীল। কারণ , কুরআন মজীদে কাফেরদের এ অভিযোগ বর্ণনা করা হয়েছে যে , তারা নবীকে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি বলেছে :

আরবী ——————————————————————————

“ জালেমরা বলেন , তোমরা নিছক একজন যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির আনুগত্য করে চলছো। ” (বনি ইসরাঈল , ৪৭)

আর এ হাদীসগুলো কাফেরদের এ অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণ করেছে। অর্থাৎ এ হাদীসগুলো থেকে প্রমাণ হচ্ছে সত্যই নবীর ওপর যাদু করা হয়েছিল।

এ বিষয়টির ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হলে সর্বপ্রথম দেখতে হবে , মূলত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যাদুর প্রভাব পড়েছিল বলে কি সহীহ ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনায় প্রমাণিত হয়েছে ? আর যদি প্রমাণিত হয়ে থাকে তাহলে তা কি ছিল এবং কতটুকু ছিল ? তারপর যেসব আপত্তি করা হয়েছে , ইতিহাস থেকে প্রমাণিত বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে সেগুলো উত্থাপিত হতে পারে কি না , তা দেখতে হবে।

প্রথম যুগের মুসলিম আলেমগণ নিজেদের চিন্তা ও ধারণা অনুযায়ী ইতহাস বিকৃত অথবা সত্য গোপন করার প্রচেষ্টা না চালিয়ে চরম সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন । বরং যা কিছু ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয়েছে তাকে হুবহু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। এ সত্যগুলো থেকে যদি কেউ বিপরীত ফলাফল গ্রহণে উদ্যেগী হয় তাহলে তাদের সংগৃহীত এ উপাদানগুলোর সাহায্যে সে যে বিপুলভাবে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারবে এ সম্ভাবনার কোন পরোয়াই তারা করেননি। এখন যদি কোন একটি কথা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বিপুল সংখ্যক ঐতিহাসিক তথ্য বিবরণীর ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় , তাহলে তা মেনে নিলে অমুক অমুক ত্রুটি ও অনিষ্টকারিতা দেখা দেবে এ অজুহাত দেখিয়ে ইতিহাসকে মেনে নিতে অস্বীকার করা কোন ন্যায়নিষ্ঠ পণ্ডিত ও জ্ঞানী লোকের কাজ হতে পারে না। অনুরূপভাবে ইতিহাস থেকে যতটুকু সত্য বলে প্রমাণিত হয় তার ওপর কল্পনার ঘোড়া দৌড়িয়ে তাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে নিজের আসল আকুতি থেকে অনেকগুণ বাড়িয়ে পেশ করাও ঐতিহাসিক সততার পরিচায়ক নয়। এর পরিবর্তে ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবে মেনে নিয়ে তার মাধ্যমে কি প্রমাণ হয় ও কি প্রমাণ হয় না তা দেখাই তার কাজ।

ঐতিহাসিক তথ্য বিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যাদুর প্রভাব চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত । তাত্ত্বিক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে যদি ভুল প্রমাণ করা যেতে পারে তাহলে দুনিয়ার কোন একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকেও সঠিক প্রমাণ করা যাবে না। হযরত আয়েশা (রা) , হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বুখারী , মুসলিম ,নাসাঈ , ইবনে মাজাহ , ইমাম আহমাদ , আবদুর রাজ্জাক , হুমাইদী , বায়হাকী , তাবারানী , ইবনে মারদুইয়া , ইবনে সা’দ , ইবনে আবী শাইবা , হাকেম , আবদ ইবনে হুমাইদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এত বিভিন্ন ও বিপুলসংখ্যক সনদের মাধ্যমে এ ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন যে , এর এক একটি বর্ণনা , ‘ খবরে ওয়াহিদ’ – এর পর্যায়ভুক্ত হলেও মূল বিষয়বস্তুটি ‘মুতাওয়াতির ’ বর্ণনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন হাদীসে এর যে বিস্তারিত বিবরণ এসেছে সেগুলো একত্র করে এবং একসাথে গ্রথিত ও সুসংবদ্ধ করে সাজিয়ে গুছিয়ে আমরা এখানে একটি ঘটনা আকারে তুলে ধরছি।

হোদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম মদীনায় ফিরে এলেন। এ সময় সপ্তম হিজরীর মহররম মাসে খয়বর থেকে ইহুদীদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় এলো। তারা আনসারদের বনি যুরাইক গোত্রের বিখ্যাত যাদুকর লাবীদ ইবনে আ’সমের সাথে সাক্ষাত করলো।  তারা তাকে বললো , মুহাম্মাদ (সা) আমাদের সাথে যা কিছু করেছেন তা তো তুমি জানো। আমরা তাঁর ওপর অনেকবার যাদু করার চেষ্টা করেছি , কিন্তু সফল হতে পারেনি। এখন তোমার কাছে এসেছি। কারণ তুমি আমাদের চাইতে বড় যাদুকর। তোমার জন্য এ তিনটি আশরাফী ( স্বর্ণ মুদ্রা ) এনেছি। এগুলো গ্রহণ করো এবং মুহাম্মাদের ওপর একটি শক্ত যাদুর আঘাত হানো। এ সময় একটি ইহুদী ছেলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কাজ করতো। তার সাথে যোগসাজশ করে তারা রসূলুল্লাহ (সা) চিরুনীর একটি টুকরা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলো। তাতে তাঁর পবিত্র চুল আটকানো ছিল সেই চুলগুলো ও চিরুনীর দাঁতের ওপর যাদু করা হলো । কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে , লাবীদ ইবনে আ’সম নিজেই যাদু করেছিল। আবার কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে — তার বোন ছিল তার চেয়ে বড় যাদুকর । তাদের সাহায্যে সে যাদু করেছিল যাহোক এ দু’টির মধ্যে যে কোন একটিই সঠিক হবে। এ ক্ষেত্রে এ যাদুকে একটি পুরুষ খেজুরের ছাড়ার আবরণের  নিচে রেখে লাবীদ তাকে বনী যুরাইকের যারওয়ান বা যী -আযওয়ান নামক কূয়াল তলায় একটি পাথর চাপা দিয়ে রাখলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রভাব পড়তে পূর্ণ এক বছর সময় লাগলো। বছরের শেষ ছয় মাসে মেজাজে কিছু পরিবর্তন অনুভূত হতে থাকলো। শেষ চল্লিশ দিন কঠিন এবং শেষ তিন দিন কঠিনতর হয়ে গেলো। তবে এর সবচেয়ে বেশী যে প্রভাব তাঁর ওপর পড়লো তা কেবল এতটুকুই যে , দিনের পর দিন তিনি রোগা ও নিস্তেজ হয়ে যেতে লাগলেন। কোন কাজের ব্যাপারে মনে করতেন , করে ফেলেছেন অথচ তা করেননি। নিজের স্ত্রীদের সম্পর্কে মনে করতেন , তিনি তাদের কাছে গেছেন অথচ আসলে তাদের কাছে যাননি। আবার কোন কোন সময় নিজের দৃষ্টির ব্যাপারেও তাঁর সন্দেহ হতো। মনে করতেন কোন জিনিস দেখেছেন অথচ আসলে তা দেখেননি। এসব প্রভাব তাঁর নিজের ব্যক্তিসত্তা পর্যন্তই সীমাদ্ধ ছিল। এমনকি তাঁর ওপর দিয়ে কি ঘটে যাচ্ছে তা অন্যেরা জানতেও পারেনি। কিন্তু নবী হিসেবে তাঁর ওপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তায় তার মধ্যে সামান্যতম ব্যাঘাতও সৃষ্টি হতে পারেনি। কোন একটি বর্ণনায়ও একথা বলা হয়নি যে , সে সময় তিনি কুরআনের কোন আয়াত ভুলে গিয়েছিলেন । অথবা কোন আয়াত ভুল পড়েছিলেন। কিংবা নিজের মসলিসে , বক্তৃতায় ও ভাষণে তাঁর শিক্ষাবলীতে কোন পার্থক্য সূচিত হয়েছিল। অথবা এমন কোন কালাম তিনি অহী হিসেবে পেশ করেছিলেন যা আসলে তাঁর ওপর নাযিল হয়নি। কিংবা তাঁর কোন নামায তরফ হয়ে গেছে এবং সে সর্ম্পকে তিনি মনে করেছেন যে , তা পড়ে নিয়েছেন অথচ আসলে তা পড়েননি

 

﴿بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ﴾

১) বলো , আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের রব ,
﴿مَلِكِ النَّاسِ﴾

২) মানুষের বাদশাহ ,
﴿إِلَٰهِ النَّاسِ﴾

৩) মানুষের প্রকৃত মাবুদের কাছে,
﴿مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ﴾

৪) এমন প্ররোচনা দানকারীর অনিষ্ট থেকে
﴿الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ﴾

৫) যে বারবার ফিরে আসে ,  যে মানুষের মনে প্ররোচনা দান করে ,
﴿مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ﴾

৬) সে জিনের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে৷

 


‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

Leave a Reply