Saturday, August 1
Shadow

মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য – পর্ব ৩

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

This entry is part 3 of 6 in the series বোনদের জন্য

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

পরম করুনাময় ও অসিম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিমণ্ডল

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিমণ্ডল কয়েকটি ক্ষেত্র বা পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা হল:

 

প্রথম ক্ষেত্র: তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্য

তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:

প্রথমত: তার প্রতিপালকের প্রতি তার ঈমান তথা বিশ্বাস প্রসঙ্গে: আর এটা হল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং আবশ্যকীয় কর্তব্যকাজ। কেননা পূর্বে উল্লেখিত আয়াতসমূহের [1] মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উত্তম প্রতিদান প্রাপ্তির সাথে তাঁর প্রতি ঈমানের শর্তারোপ করেছেন; তিনি  বলেন:

 

﴿ وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ نَقِيرٗا ١٢٤﴾ [سورة النساء: 124]                                                                                                                                    

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎ কাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।”  ( সূরা আন-নিসা: ১২৪ )

তাছাড়া এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আরও অনেক আয়াত রয়েছে।

 

এই ঈমানের অনুসরণকারীকে ঈমানের ছয়টি রুকন মেনে চলতে হবে—

 

(ক) আল্লাহর প্রতি ঈমান: এর মানে আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদের তিনটি অংশের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করা। যথা:

 – আল্লাহ তা‘আলার কাজের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। একজন মুসলিম নারী ঈমান আনবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা হলেন সকল কিছুর মালিক, পরিচালনাকারী, সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা। তিনি বলেন:

 

﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ٣ مَٰلِكِ يَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤ ﴾ [ سورة الفاتحة: 2 – 4 ]

“সকল প্রশংসা সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহরই; যিনি দয়াময়, পরম দয়ালু; কর্মফল দিবসের মালিক।” (সূরা আল-ফাতিহা: ২ – ৪)

তাছাড়া আরও অনেক আয়াত রয়েছে। আর এটাই হল রব হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ আর-রুবূবিয়াহ)।

 

– বান্দাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। একজন মুসলিম নারী ঈমান আনবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা হলেন একচ্ছত্র মা‘বুদ তথা ইবাদতের উপযুক্ত এবং সে সকল প্রকার ইবাদত তাঁকে উদ্দেশ্য করেই করবে। তাই সে সালাত আদায় করবে আল্লাহর জন্য, পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা অর্জন করবে আল্লাহর জন্য; সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে না; আর সে আল্লাহর কারণেই পিতা-মাতার আনুগত্য করবে; পর্দা করবে আল্লাহ্‌র আনুগত্য করে; আর আল্লাহর নিকট যা আছে, তা পাওয়ার আশায়ই স্বামীর আনুগত্য করবে … এভাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴾ وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦  ﴿ سورة الذاريات: 56 

“আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তারা শুধু আমারই ইবাদত করবে।”  (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)

আর এটাই হল ইলাহ হিসেবে তাঁর একত্ববাদ (তাওহীদ আল-উলূহিয়াহ), অথবা ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ (তাওহীদ আল-‘ইবাদাহ্)।

 

 তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। মুসলিম নারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য সাব্যস্ত করবে সকল সুন্দর নামসমূহ এবং মহৎ গুণাবলী। আর তা করতে হবে যেকোনো প্রকার অপব্যাখ্যা, তার ধরন-প্রকৃতি খোঁজা, সৃষ্টির গুণাবলীর সাথে সেগুলোর সাদৃশ্যস্থাপন অথবা এগুলোকে অর্থশূন্য করা ছাড়াই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [ سورة الشورى: 11 ]

“কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”  (সূরা আশ-শুরা: ১১)

 

 মুসলিম নারী এসব সুন্দর নামসমূহ এবং মহৎ গুণাবলীর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে। সে স্বীকৃতি দেবে যে, আল্লাহ হলেন দয়াময়, পরম দয়ালু; তাই সে তাঁর নিকট রহমত কামনা করবে। তিনি হলেন রিযিকদাতা, পরম শক্তির অধিকারী; তাই সে তাঁর নিকট রিযিকের জন্য আবেদন করবে। তিনি হলেন রোগ নিরাময়কারী ও যথেষ্ট, সুতরাং সে তাঁর নিকট রোগ থেকে মুক্তির জন্য আবেদন করবে। আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাপরায়ণ; তাই সে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তিনি হলেন মার্জনাকারী ও দানশীল; তাই সে তাঁর নিকটই মাফ চাইবে … ইত্যাদি।

 

(খ) ফেরেশতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: সুতরাং মুসলিম নারী বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার অনেক ফেরেশতা রয়েছে, যারা রাতদিন অক্লান্তভাবে তাঁর দাসত্ব করে; আর তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আছে যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে; আর তাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, যার নাম ও গুরুত্ব আমাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে; যেমন: জিবরাঈল আ. যিনি ওহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত; ইস্রাফিল আ. যিনি সিঙায় ফুঁ দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত; আর সেখানে পাহাড়-পর্বত, বাতাস এবং বান্দাদের হিসাব-নিকাশ ও তাদের কর্মতৎপরতা লিপিবদ্ধ করার জন্য আরও অনেক ফেরেশতা রয়েছে; এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে দু’জন করে ফেরেশতা রয়েছে, যারা ঐ ব্যক্তি থেকে প্রকাশিত প্রতিটি কথা ও কাজ লিপিবদ্ধ করে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ إِذۡ يَتَلَقَّى ٱلۡمُتَلَقِّيَانِ عَنِ ٱلۡيَمِينِ وَعَنِ ٱلشِّمَالِ قَعِيدٞ ١٧ مَّا يَلۡفِظُ مِن قَوۡلٍ إِلَّا لَدَيۡهِ رَقِيبٌ عَتِيدٞ ١٨﴾ [ سُورَةُ قٓ: 17-18]

“স্মরণ রাখ, দুই সাক্ষাৎ গ্রহণকারী ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।”  ( সূরা ক্বাফ: ১৭ – ১৮ )

 

(গ) রাসূলদের উপর নাযিলকৃত আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা:আল-কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে তার উল্লেখ রয়েছে; তন্মধ্যে আমাদের জন্য চারটি কিতাবের নাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: তাওরাত, যা মূসা ‘আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে; ইঞ্জিল, যা ঈসা ‘আলাইহিস সালামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে; যাবুর, যা দাউদ ‘আলাইহিস সালামকে দেয়া হয়েছে এবং আল-কুরআন, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। আর আল-কুরআনুল কারীম হল সর্বশেষ কিতাব, যার মাধ্যমে কিতাব অবতীর্ণের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে এবং যা বাকি সকল কিতাবের বিধানকে রহিত করে দিয়েছে; আর তার (কুরআনের) মধ্যে যা এসেছে, তা ব্যতীত অন্য কোন কিতাবের বিধান অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা বৈধ নয়।

(ঘ) মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রেরিত রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: তারা মানুষকে সুসংবাদ দেয়, সতর্ক করে এবং তাদের প্রতিপালকের ইবাদত করার আবশ্যকতার কথা তাদের নিকট প্রচার করে। আর ঐসব রাসূলদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, আমাদের জন্য যাদের নাম আলোচিত হয়েছে; আর তাদের মধ্যে এমন অনেক রয়েছেন, যাদের নাম আলোচিত হয় নি; সুতরাং মুসলিম নারী তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, যাদের নাম বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে তাদের প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করবে, যাদের নাম উল্লেখ করা হয় নি। আর তাদের মধ্যে প্রথম হলেন নূহ ‘আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যার মাধ্যমে নবুওয়ত ও রিসালাতের ধারার সমাপ্তি ঘটে এবং তিনি তাদের মধ্যে সর্বশেষ, তাঁর পরে আর কোন নবী আসবে না; তাঁকে সকল মানুষ ও জিনের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে; আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শরী‘আত প্রবর্তন করেছেন, সে অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না হলে তা বৈধ হবে না।

 

(ঙ) আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: মানুষের এই জীবনের পরিসমাপ্তির সূচনা হয় কতগুলো ভূমিকা বা উপাদানের মাধ্যমে; আর তা হল তার মৃত্যু ও পরবর্তী জীবনে স্থানান্তরের মাধ্যমে; আর কবরের ফিতনা (পরীক্ষা), তার নিয়ামত ও শাস্তির মাধ্যমে; আর কিয়ামতের ছোট ও বড় শর্ত বা নিদর্শনের মাধ্যমে; অতঃপর পুনরুত্থান বা পুনরায় জীবিত করা, হাশর (সমাবেশ), হিসাব, প্রতিদান ও সিরাত (পুলসিরাত) এবং সব শেষে জান্নাত ও জাহান্নামে মাধ্যমে।

 

এই হল মুসলিম নারীর আকিদা বা বিশ্বাস, যার উপর ভিত্তি করে তার নিজের জীবনকে গড়ে তোলা এবং সে ব্যাপারে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকা আবশ্যক

 

অতঃপর এই ঈমান বা বিশ্বাস আরও কতগুলো আবশ্যকীয় বিষয়কে অনুসরণ করে; যেমন: আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা, তাঁর প্রতি একনিষ্ঠতা; তাঁর নিকট প্রত্যাশা করা, তাঁকে ভয় করা; আর সে এগুলো জেনে রাখবে এবং তার উপর ধৈর্যধারণ করবে; আর সে এই আকিদা-বিশ্বাস পরিপন্থী কর্মকাণ্ডসমূহ এবং ঈমান বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকবে; আর এগুলোর শীর্ষে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা, কুফরী করা, নিফাকী করা এবং আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর দীন ও তিনি যে শরী‘আত প্রবর্তন করেছেন, তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা; অথবা যে কোন প্রকারের ইবাদত আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারও উদ্দেশ্যে করা; অথবা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের বিধান আল্লাহ তা‘আলার বিধানের সমান বা তার চেয়ে উত্তম বলে বিশ্বাস করা এবং এই বিশ্বাস করা যে, মানবতা এমনিতেই সৌভাগ্যবান হবে, যেমনিভাবে সে আল্লাহ তা‘আলার বিধানের মধ্যে সৌভাগ্যবান হয়; অথবা এই বিশ্বাস করা যে, যুগ-যামানা আল্লাহ তা‘আলার বিধান নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে এবং তা পবিত্র উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ হিসেবে অবিশিষ্ট রয়েছে; এই জীবনে তার উপর আমলের প্রয়োজন নেই; অথবা জাদুকর ও জ্যোতিষীর কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ঈমান বিনষ্টকারী জাদুকর, ভেল্কিবাজ ও ভণ্ড-প্রতারকদের অনুসরণ করা।

 

সুতরাং মুমিন নারীর আবশ্যকীয় কর্তব্য হল, সে এই ধরনের ভয়াবহ শিরকে নিপতিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকবে; অতএব সে ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং আরও দায়িত্বপ্রাপ্ত ঈমান বিনষ্ট করে, এমন বিষয় থেকে সতর্ক থাকার ব্যাপারে।

 

দ্বিতীয়ত: তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ থেকে অন্যতম হল জ্ঞান অর্জন:

আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল শরী‘আতের জ্ঞান, যার দ্বারা তার দীন প্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ, এই দীন জ্ঞান ব্যতীত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; আর তা হল আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে জ্ঞান এবং তাঁর দীন ও শরী‘আত সম্পর্কিত জ্ঞান। আর এই জ্ঞান দুইভাগে বিভক্ত:

(ক) ফরযে আইন: এই প্রকারের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারীর উপর ফরযে আইন তথা আবশ্যকীয় কর্তব্য; আর তা এমন জ্ঞান, যার দ্বারা দীনের জরুরি বিষয়গুলো জানা ও বুঝা যায়; অথবা অন্যভাবে বলা যায়: এটা এমন জ্ঞান, যা ব্যতীত দীন প্রতিষ্ঠিত হয় না; যেমন: সামগ্রিকভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন সম্পর্কিত বিধানসমূহ, পবিত্রতা অর্জন সম্পর্কিত বিধানসমূহ, সালাত (নামায) সম্পর্কিত বিধানসমূহ; সুতরাং মুসলিম নারী শিক্ষা লাভ করবে সে কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে? কিভাবে সে সালাত (নামায) আদায় করবে? কিভাবে সাওম (রোযা) পালন করবে? কিভাবে সে তার স্বামীর হক আদায় করবে? আর কিভাবে সে তার সন্তানদেরকে লালনপালন করবে? এবং এমন প্রত্যেক জ্ঞান, যা তার উপর বাধ্যতামূলক।

 

(খ) আরেক প্রকার জ্ঞান অর্জন করা ফরযে কিফায়া: আর তা এমন জ্ঞান, যা কিছুসংখ্যক ব্যক্তি অর্জন করলে বাকিরা অপরাধমুক্ত হয়ে যায়; আর মুসলিম নারীর জন্য এই প্রকার জ্ঞান অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং সেই জ্ঞান অর্জন করে পরিতৃপ্তি লাভ করাটা উত্তম বলে বিবেচিত হবে। কুরআন ও সুন্নাহ এই জ্ঞান অর্জনের প্রশংসায়, তার ফযিলত বা মর্যাদা বর্ণনায় এবং এ প্রকার জ্ঞান ও জ্ঞানীদের গুরুত্ব বর্ণনায় অনেক বক্তব্য নিয়ে এসেছে; আরও বক্তব্য নিয়ে এসেছে অন্যদের উপর তাদের উচ্চমর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায়; কারণ, তারা হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরসুরী।

 

ইবনু আবদিল বার আল-আন্দালুসী র. বলেন:

“আলেমগণ এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, ইলম বা জ্ঞানের মধ্যে এক প্রকার এমন রয়েছে, যা প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে ফরযে আইন; আরেক প্রকার হল ফরযে কিফায়া … অবশেষে তিনি বলেন: এর থেকে যতটুকু সকলের উপর আবশ্যক তা হচ্ছে যে সকল বস্তু তার উপর ফরয করা হয়েছে, যা না জেনে থাকার সুযোগ নেই সে ফরযটুকু জানা।”   

 

মুসলিম নারীকে ইসলাম যে সম্মান দান করেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হল: ইসলাম নারীর জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা ও শিক্ষা প্রদান করার মর্যাদা পুরুষের মর্যাদার মত করে সমানভাবে নির্ধারণ করেছে এবং নারীকে বাদ দিয়ে পুরুষের জন্য কোন বিশেষ মর্যাদা নির্দিষ্ট করে নি। শিক্ষা এবং শিক্ষা গ্রহণের ফযিলত বা মর্যাদা বর্ণনায় বর্ণিত সকল আয়াত ও হাদিস পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে মর্যাদাবান বলে অবহিত করে; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ يَرۡفَعِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَٰتٖۚ﴾ [ سُورَةُ المجادلة: 11 ]

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন।”  (সূরা আল-মুজাদালা: ১১)

তিনি আরও বলেন:

﴿ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلَّذِينَ يَعۡلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَۗ ﴾ [سُورَةُ الزُّمَرِ: 9]

“বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” ( সূরা আয-যুমার: ৯ )

 তিনি আরও বলেন:

﴿ وَقُل رَّبِّ زِدۡنِي عِلۡمٗا ١١٤ ﴾ [ سُورَةُ طه: 114 ]

“বল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ কর।”  ( সূরা ত্বা-হা: ১১৪ )

 

অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

 

« مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِى السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِى الأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِى جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ ». ( أخرجه أبو داود و الترمذي و ابن ماجه ).

 

“যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন পথ অবলম্বন করে, এর উসিলায় আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতের পথসমূহ থেকে একটি পথে পরিচালিত করেন। নিশ্চয়ই ইলম (জ্ঞান) অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য ফেরেশতাগণ তাদের পাখাসমূহ বিছিয়ে দেন। আর আলেমের জন্য আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সকলেই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি গভীর পানির মাছও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। সুতরাং একজন আবেদের (ইবাদতকারীর) উপর আলেমের মর্যাদা তেমনি, যেমন পূর্ণিমার রাতে সকল তারকার উপর চাঁদের মর্যাদা। নিশ্চয়ই আলেমগণ নবগণের ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী)। আর নবীগণ কোন দিনার এবং দিরহামের উত্তরাধিকারী রেখে যাননি; বরং তাঁরা শুধুমাত্র ইলমকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করল, সে পরিপূর্ণ অংশ (উত্তরাধিকার) গ্রহণ করল।” – ( ইমাম আবূ দাউদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ হাদিসখানা বর্ণনা করেন )। [2]

এগুলো ছাড়াও কুরআন ও সুন্নাহর আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে, যার প্রতিটি বক্তব্যই সমানভাবে পুরুষ ও নারীকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর অনুরূপভাবে প্রথম প্রজন্মের নারীগণ জ্ঞান অর্জনের এই নীতি অবলম্বন করেছেন; মুমিন জননী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা জ্ঞান অন্বেষণকারিনী এবং সে ক্ষেত্রে প্রতিযোগী নারীদের জন্য নিজেকে অত্যন্ত চৌকস ব্যক্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত পেশ করেন; এমনকি তিনি অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের মধ্যে অন্যতমা ছিলেন এবং অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে তিনি তাদের তথ্যসূত্র বা আশ্রয়স্থল হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন। আর তিনি সাহাবীদের কারও কারও দেয়া বিধিবিধানের ভুল সংশোধন করে দিতেন।

আর তিনি ছাড়াও আরও অনেক মহিলা সাহাবী জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।[3]

 

 

আর অধ্যাপক ডক্টর আবদুর রহমান আয-যুনাইদী নারীর শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পর্যালোচনা করেছেন; আর তা আলোচিত হয়েছে ‘নারীর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য’ (مسئولية المرأة الثقافية)  শিরোনামের একটি পুস্তিকায়; সেখানে তিনি প্রথমে কতগুলো চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরেছেন, মুসলিম নারী এই যুগে যেগুলোর মুখোমুখি হয়; আর তা হল:

 

প্রথম চিত্র: ইসলামী ধ্যানধারণার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকা; অন্যভাবে বলা যায়: তার ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসকে বিশৃঙ্খলামুক্ত না করা; ফলে তার ইলাহ অথবা জীবন অথবা সৃষ্টি সম্পর্কিত বিশ্বাস ও ধ্যানধারণা থাকে বিকৃত; ফলে সে দুর্বল আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।

 

দ্বিতীয় চিত্র: পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার সামাজিক অবস্থান। অর্থাৎ কোন কোন পুরুষ কর্তৃক তার পরিবারের সাথে বিদ্যমান নেতিবাচক অবস্থান। আর এটাকেই মুসলিম নারী তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে, পরিবারে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারটি সে সার্বিকভাবে বিবেচনা করতে সক্ষম হয় না। যেখানে পরিবারে নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার কথা, সেখানে পুরুষ লোকটি সে সম্পর্কে ছেদ ঘটায় এবং সেটাকে পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় না।

 

তৃতীয় চিত্র: চিন্তাগত অস্থিরতা, যা নিয়ে এই যুগ উত্তাল হয়ে আছে; যেমন আমদানিকৃত সংস্কৃতি, যা মুসলিম নারীর উপর সংকট সৃষ্টি করে এবং তাকে নিক্ষেপ করে ধ্বংস, অপ্রিয় ও ঘৃণ্য চরিত্রের পথে; এমনকি শিল্প, নৃত্য ইত্যাদি হয়ে যায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার পাওয়ার মত বস্তুর অন্তর্ভুক্ত, যাকে আজকের নারীসমাজ গুরুত্ব দিয়ে থাকে; আর এটা বিপজ্জনক ও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

চতুর্থ চিত্র: তথ্যপ্রযুক্তি বা মিডিয়া; আর কোন সন্দেহ নেই যে, এটাও একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ, কারণ এতে ভাল ও মন্দ সবই একসাথে রয়েছে। যার দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে এমন সংস্কৃতি, যা দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করে, মুসলিম নারীর ব্যক্তিত্বের উপর আক্রমন করে, শিশুদেরকে তাদের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করার প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের স্বভাব-প্রকৃতিকে সত্য পথ থেকে ভিন্নমুখী করে দেয়। আর মুসলিম নারী এই দূষিত পরিবেশের মধ্যে জীবনযাপন করে, যার কারণে এই জীবনে তার নির্মল জীবনধারা কলুষিত হয়।

 

পঞ্চম চিত্র: আর আমি এখানে পঞ্চম চিত্রটি বৃদ্ধি করেছি; আর তা হল: নৈতিক বিপর্যয়, যা কোন কোন মুসলিম সমাজের গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে এবং তা মুসলিম নারীসমাজের উপর নগ্নভাবে আক্রমন করেছে ও তার জন্য সমাজটিকে বাস্তবতার বিপরীতরূপে চিত্রিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে যেসব অনৈতিক বিষয়াদি ও কর্মকাণ্ড পরিবেশিত হয় এবং তাতে দীনের কিছু কিছু শিক্ষা ও দর্শনকে যেভাবে সেকেলে ও পশ্চাৎপদতা দ্বারা চিত্রিত করা হয়, তাতে এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা জাতির অনুসরণ করে ব্যাপক অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে; যাতে বলা হয় বিয়ে-সাদী হল বন্দী করা বা আটকিয়ে রাখা; আর তার সমাধান হল ভোগবিলাসে মত্ত থাকা এবং এরূপ আরও অনেক শ্লোগান।

 

ষষ্ঠ চিত্র: নারী জাতির বিশ্বায়ন; আর তা হল পশ্চিমা নাস্তিকগণ আহ্বান করে যে, আদর্শ নারী হল পশ্চিমা নারী, যে অধিকারের ব্যাপারে পুরুষের সমান; শিল্প-কারখানায় পুরুষের মত শ্রমিক, সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিনী ইত্যাদি।

 

আর এই চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো প্রকাশ হতে শুরু করে তাদের ঐসব সম্মেলনে, যেগুলোতে তারা লোকদের আহ্বান করে, আর জাতিসংঘ যেগুলোর তত্ত্বাবধান করে এবং তার মূলনীতিমালা বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়; যেমন শ্রমজীবি নারীকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিবেচ্য নারী হিসেবে তাদের মূল্যায়ন, হোম মেকার বা গৃহিনীদেরকে বিভিন্নভাবে পশ্চাদপদ বলে অবমূল্যায়ন করে। আর এর মধ্যে আরও রয়েছে, কতগুলো পরিবর্তিত পরিভাষার অনুপ্রবেশ; যেমন: নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করার তাৎপর্য ব্যাখ্যার জন্য তারা “ المساواة ” (সমতা) শব্দের ব্যবহার; আর যৌনস্বাধীনতা ও নৈতিকতা বর্জনের জন্য “التنمية” (প্রগতি) শব্দের ব্যবহার।

 

কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জ সত্বেও আশার আলো তাদের মধ্যে তাদের মধ্যে থাকবে যারা তাদের দীনকে উপলব্ধি করেছে এবং তাদের শত্রুদের পাতানো পরিকল্পনার ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন থেকেছে, তাদের ব্যাপারে আশার আলো সুস্পষ্টভাবে আলোকিত হয়ে আছে যা মনকে করে আনন্দিত এবং তাকে আস্থা, বিশ্বাস ও প্রশান্তিতে ভরে দেয়।

সংকলন : ফালেহ বিন মুহামাম্মাদ আস-সাগির | অনুবাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

[চলবে]

 

Series Navigation<< মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য – পর্ব ২মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য – পর্ব ৪ >>

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথেঃ

Leave a Reply